শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে বাবার ভূমিকা

Amirul Islam Sizan

শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশে বাবার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রারম্ভিক দিনগুলোতে বাবার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ শিশুর জন্য জীবনব্যাপী সুফল এনে দেয়।  

বাবার সম্পৃক্ততা কেন এত জরুরি? কিভাবে শিশুর বিকাশ ঘটে? কিভাবেই বা বাবা-সন্তানের প্রত্যাশিত সম্পর্কটা তৈরি হবে? এসব নিয়ে কথা বলছিলাম আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যে নব্য বাবা হয়েছে এবং নবজাতক কন্যাকে নিয়ে আনন্দে, আগ্রহে বাবা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। খেলনা, খাবার, পোশাক, চিকিৎসার জোগান দিচ্ছে তাই নয়, সন্তানের যত্নেও সময় দিচ্ছে। এ বিষয়ে তার জানার ও বোঝার ইচ্ছা আমার মধ্যে একই সাথে আনন্দ ও যন্ত্রণার বোধ তৈরি করল; কারণ সন্তান লালন পালনে আমাদের প্রস্তুতি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় নি। একটি ক্ষুদ্র অংশ বাদ দিলে শিশুর বিকাশ সম্পর্কে জানার সুযোগ বা তাগিদ দুটোই এখনো সীমিত। 

প্রথম আট বছরকে শিশুর বিকাশের প্রারম্ভিক সময় বলা হয়। এই সময়ের যত্ন ও বৃদ্ধি তার ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য, শিখন, সুখ, এমনকি সম্পর্কের গতিপথ তৈরি করে দেয়। আরও সুনির্দিষ্টভাবে, জন্মের ১০০০ দিনের মধ্যে মানব মস্তিষ্কের পচাত্তর শতাংশ গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়। মস্তিষ্কের নিউরনের মাঝে সংযোগ ঘটতে থাকে দ্রুততম গতিতে। এই সময় শিশুর যথাযথ যত্ন, শিশুর সাথে মিথস্ক্রিয়া নির্ধারণ করে দেয় পরবর্তী জীবনে সে তার সম্ভাবনাকে কতটা সফলভাবে কাজে লাগাতে পারবে। 

গবেষণায় দেখা গেছে যে সকল শিশু প্রারম্ভিক দিনগুলোতে বাবার বা পিতৃ স্থানীয় কারও যত্ন ও সান্নিধ্য পায় পরবর্তী জীবনে তাদের সাফল্যের হার অনেক বেশি। মা-বাবা দুজনের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে শিশু নিরাপত্তা বোধ করে, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তারা এগিয়ে থাকে, সামাজিক ও যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্ম নিয়ন্ত্রণের মত বিষয়ে অধিক সক্ষমতা অর্জন করে। আচরণগত সমস্যা, বয়ঃসন্ধিকালের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা তাদের মধ্যে কম থাকে। এমনকি পারিবারিক জীবনেও উন্নত সম্পর্ক তৈরিতে সক্ষম হয়। বাবার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রভাব শিশুর জীবনে কতটা গভীর তা বুঝতে পারলে সন্তানের যত্নে সম্পৃক্ত হওয়া বাবার জন্য সহজ হয়। 

বাবার সম্পৃক্ততা বলতে বোঝায়, সন্তানের জন্য দায়িত্ব অনুভব এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা, মানসিক ও শারীরিকভাবে শিশুর কাছাকাছি থাকা, বস্তুগত সেবা নিশ্চিত করা, শিশুর যত্ন নেয়া ও তার লালন পালন সংক্রান্ত বিষয়ে একত্রে সিদ্ধান্ত নেয়া। 

সন্তানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তৈরি হল প্রথম শর্ত। শিশুর যত্নের প্রতিটি কাজ হতে পারে তার সাথে যোগাযোগ তৈরির সুযোগ। যখন শিশুকে খাওয়াচ্ছেন বা পোশাক পালটে দিচ্ছেন, তার সাথে কথা বলুন, তার শব্দকে অনুকরণ করুন। প্রতিটি আদর, গল্প-গান-কথা তার মস্তিষ্কের গঠনে কাজ করতে থাকে। খুব সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল শিশুর সাথে খেলা করা কারণ খেলাই শিশুর শেখার মাধ্যম। মাত্র ১৫ মিনিট খেলা শিশুর মস্তিষ্কে হাজার হাজার নিউরনের সংযোগ ঘটাতে পারে। শিশুর যথাযথ বিকাশের প্রথম ধাপ হল তার সাথে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা যা মূলত জন্মের ছয় মাসেই শিশু মধ্যে গড়ে ওঠে। তাই জন্মের পর হতেই সন্তানের লালন পালনে বাবার সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। 

শিশুর যত্নে অনেক করনীয় যেমন রয়েছে তেমনি আবার কিছু আচরণ না করা টাও প্রয়োজন। শিশুর কান্না বিরক্তিকর হলেও খাবার দিয়ে, পরিষ্কার করে বা কোলে নিয়ে তাকে শান্ত করা বা প্রয়োজনে অন্যের সাহায্য নেয়া যেতে পারে তবু তাকে ধরে ঝাঁকানো বা চিৎকার করার মত ক্ষতিকর কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। সন্তানের সামনে তার মায়ের সাথে কিভাবে কথা বলছেন তাও শিশুকে প্রভাবিত করবে। 

কোন বাবা হয়তো ভাবছেন আমাকে তো সারাদিন বাইরে থাকতে হয়, সন্তানকে দেয়ার মত পর্যাপ্ত সময় নেই। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, কতটা সময় সন্তানের সাথে থাকলেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিভাবে সময়টা ব্যবহার করলেন। আবার কোন শিশুর জীবনে তার জন্মগত পিতার উপস্থিতি নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে পিতৃস্থানীয় কারো সম্পৃক্ততা শিশুকে সুফল দেবে। 

এই আপাত সহজ কাজগুলোর বাস্তবায়ন কিন্তু খুব সহজ নয় যতক্ষণ না আমাদের আচরণ ও দৃষ্টি ভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারছি। জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ এখনো মনে করেন সন্তানের যত্ন মায়ের দায়িত্ব, আবার কিছু বাবারা লালন পালনে অংশ নিলেও তা অনেকটাই সহযোগীর ভূমিকায় থেকে যায়। সন্তান পালনে স্ত্রীকে সহযোগিতা নয় বরং বাবার পূর্ণাংগ ভূমিকায় নিজেকে দেখতে চাওয়াটা জরুরি। প্রবল পুরুষতন্ত্র তখন সামনে এসে দাঁড়াবে। তাই সন্তানকে সফল জীবনের সুযোগ করে দিতে চাইলে প্রথাগত সামাজিক লিঙ্গীয় ভূমিকায় পরিবর্তনের কোন বিকল্প নেই। এর সাথে প্রয়োজন সহায়ক নীতি কাঠামো। সন্তান লালন পালনে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা যেমন বাবা মায়ের প্রশিক্ষণ, পিতৃত্ব কালীন ছুটি, বাড়ি পরিদর্শন সেবা, শিশু বিকাশ কেন্দ্র, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কৌশল ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয় তবে সে আলোচনায় এখন যাচ্ছি না। 

করোনা মহামারি যে বৈশ্বিক দুর্যোগ তৈরি করেছে তা নিয়ে একটু বলতে চাই কারন ব্যক্তি ও পরিবারকে নতুন এই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে হবে সম্ভবত আরও বহুদিন, যার প্রথম পর্যায় আমরা পার করছি গৃহরুদ্ধ থেকে। যদিও আমাদের সুযোগ হয়েছে পরিবারের সাথে সময় কাটাবার, এই অপ্রস্তুত পরিবর্তন প্রত্যেকের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে যার  ফলে শিশুর স্বাভাবিক যত্নে ঘাটতি পড়ছে, তারচেয়েও আশঙ্কাজনক, নারী ও শিশু নির্যাতনের হার বেড়ে গেছে। দীর্ঘ হলেও এই সঙ্কট একসময় কেটে যাবে কিন্তু ক্ষতিকর আচরণের ক্ষত শিশুকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় আর কখনই পৌঁছতে দেবে না। তাই আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে এই চাপের কাছে আমরা হেরে যাবো নাকি সন্তানের সাথে ইতিবাচক সম্পর্কে যত্নশীল থাকব।